হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল (৩০ অক্টোবর) দারুল যাহরা (সা.) ইনস্টিটিউটে ধর্মীয় প্রচারক ও বক্তাদের সাপ্তাহিক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন আয়াতুল্লাহ তাবাসি।
আহলে বাইতের (আ.) মর্যাদা ও গুণাবলি প্রচারের গুরুত্ব
আহলে বাইতের (আ.) প্রকৃত মর্যাদা ও গুণাবলি মানুষের কাছে তুলে ধরার গুরুত্ব বোঝাতে ইমাম মুহাম্মদ বাকিরের (আ.) একটি হাদিস উল্লেখ করেন আয়াতুল্লাহ তাবাসি।
তিনি বলেন, সা'দ আসকাফ বর্ণনা করেন, একবার তিনি ইমাম মুহাম্মদ বাকিরের (আ.) কাছে গিয়ে বলেন, ‘আমি বিভিন্ন বৈঠকে হাদিস বর্ণনা করি, ধর্মীয় জ্ঞান তুলে ধরি এবং মানুষের সামনে আপনাদের আহলে বাইতের অধিকার ও মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দিই।’
জবাবে ইমাম মুহাম্মদ বাকির (আ.) বলেন, ‘প্রতি ৩০ হাত দূরত্বে তোমার মতো একজন বর্ণনাকারী ও বক্তা থাকুক—এটাই আমি কামনা করি।’
আয়াতুল্লাহ তাবাসি বলেন, আহলে বাইতের (আ.) শিক্ষা ও মর্যাদা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বক্তাদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই হাদিস থেকেই তা স্পষ্ট হয়।
একসময় ৭০ হাজার মিম্বার থেকে ইমাম আলীর (আ.) বিরুদ্ধে অভিশাপ দেওয়া হতো
ইতিহাসের একটি কঠিন সময়ের কথা উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ তাবাসি বলেন, একপর্যায়ে প্রায় ৭০ হাজার মিম্বার ও বক্তৃতামঞ্চ থেকে আমিরুল মুমিনিন ইমাম আলীর (আ.) বিরুদ্ধে অভিশাপ দেওয়া হতো।
তিনি বলেন, আহলে বাইতের শত্রুরা ইমাম আলী (আ.) ও হজরত ফাতিমা জাহরার (সা.) নাম শুনতেও অসন্তুষ্ট হতো। সে সময় প্রকাশ্যে ইমাম আলী (আ.)-কে গালিগালাজ ও অভিশাপ দেওয়া হতো। এমনকি কেউ কেউ ঔদ্ধত্যের সঙ্গে হজরত ফাতিমা জাহরাসহ (সা.) আহলে বাইতের পবিত্র মর্যাদা নিয়েও অবমাননাকর মন্তব্য করত।
আহলে বাইতের শিক্ষা প্রচার ছিল ইমাম বাকিরের (আ.) আকাঙ্ক্ষা
আহলে বাইতের (আ.) শিক্ষা ও গুণাবলি প্রচারের গুরুত্ব তুলে ধরে আয়াতুল্লাহ তাবাসি বলেন, তাঁদের প্রকৃত মর্যাদা মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং এ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য মজলিস আয়োজন করা ছিল ইমাম মুহাম্মদ বাকিরের (আ.) অন্যতম আকাঙ্ক্ষা।
তিনি বলেন, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে আহলে বাইতের (আ.) পক্ষে কথা বলা এবং তাঁদের মর্যাদা ও গুণাবলি তুলে ধরার কারণে অনেককে কঠিন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এমনকি কাউকে কাউকে এ কারণে শহীদও করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের মুখ ও ঠোঁট ছিঁড়ে ফেলার মতো নৃশংস নির্যাতন চালানো হয়েছে, যাতে তাঁরা আহলে বাইতের (আ.) মর্যাদা ও সত্য তুলে ধরা থেকে বিরত থাকেন।
আয়াতুল্লাহ তাবাসি বলেন, বর্তমানে ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ওয়াহাবি ধারার বিভিন্ন গোষ্ঠীও নিজেদের মতাদর্শ প্রচারে সক্রিয় এবং এ কাজে নানা ধরনের উপকরণ ও মাধ্যম ব্যবহার করছে। তাই আমাদেরও আহলে বাইতের (আ.) শিক্ষা ব্যাখ্যা এবং তাঁদের আদর্শ ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিদ্যমান সুযোগগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। তাঁদের শিক্ষা ও গুণাবলি মানুষের সামনে তুলে ধরা ধর্মীয় প্রচারকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সরাসরি যোগাযোগই ধর্মীয় প্রচারের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি
ধর্মীয় প্রচারের কার্যকর পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রচারের জন্য নানা সুযোগ রয়েছে। তবে মানুষের সঙ্গে সরাসরি ও মুখোমুখি যোগাযোগের চেয়ে কার্যকর পদ্ধতি আর নেই।
তিনি বলেন, ধর্মীয় শিক্ষা ও আদর্শ প্রচারের নানা মাধ্যম থাকলেও মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এখনো অন্যতম সফল পদ্ধতি। এর মাধ্যমে প্রচারক শ্রোতাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কথা বলতে পারেন, তাঁদের প্রশ্ন শুনতে পারেন এবং তাঁদের সঙ্গে আরও গভীর ও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন।
আয়াতুল্লাহ তাবাসি বলেন, মহান আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন যোগ্যতা ও প্রতিভা দান করেছেন। এসব সক্ষমতা তাঁর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ। তাই এগুলো সঠিক পথে এবং আহলে বাইতের (আ.) শিক্ষা প্রচারের কাজে ব্যবহার করা উচিত।
লেখালেখির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, লেখার যোগ্যতা ও কলম পরিচালনার ক্ষমতা আল্লাহর দেওয়া অন্যতম নিয়ামত। যাঁদের এই প্রতিভা রয়েছে, তাঁদের উচিত আহলে বাইতের (আ.) আদর্শ ও গুণাবলি তুলে ধরা এবং ধর্মীয় জ্ঞান বিস্তারের কাজে কলম ব্যবহার করা। সমাজের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিতে এই সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে।
ধর্মীয় প্রচারে দক্ষতা ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতার গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, যাঁদের মধ্যে প্রচারের বিশেষ যোগ্যতা রয়েছে, তাঁরা বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারেন। এর মাধ্যমে তরুণদের কাছে ধর্মীয় বিষয়বস্তু পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তরুণ প্রজন্মের কাছে মুবাল্লিগদের পৌঁছানোর আহ্বান
তরুণদের সঙ্গে ধর্মীয় প্রচারকদের যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আয়াতুল্লাহ তাবাসি বলেন, বর্তমানে তরুণরা ধর্মীয় জ্ঞান, আলোচনা ও পরামর্শের জন্য আপনাদের মুখাপেক্ষী। তাদের এই প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন প্রজন্মের চিন্তাভাবনা, প্রশ্ন, উদ্বেগ ও মানসিক অবস্থা বুঝে তাদের সঙ্গে কার্যকর ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, ধর্মীয় প্রচার অবশ্যই মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর জন্য প্রচারককে মানুষের নাগালের মধ্যে থাকতে হবে এবং তাদের প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
সমাজে ধর্মীয় প্রচারের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা যদি এমন কোনো স্থানে প্রচারের জন্য যাই, যেখানে তরুণরা আসে না, তাহলে শুধু তাদের আমাদের কাছে আসার অপেক্ষায় বসে থাকা উচিত নয়। বরং আমাদেরই তাদের কাছে যেতে হবে, যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে।
সংক্ষিপ্ত মিম্বার, তবে বক্তব্য হতে হবে সমৃদ্ধ ও গভীর
ধর্মীয় বক্তৃতার আগে যথাযথ অধ্যয়ন ও প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আয়াতুল্লাহ তাবাসি বলেন, মিম্বারে বক্তব্যের সময় সংক্ষিপ্ত হওয়া ভালো। তবে সীমিত সময়ের মধ্যেই শ্রোতাদের সামনে সমৃদ্ধ, উপকারী ও কার্যকর বিষয়বস্তু তুলে ধরতে হবে।
তিনি বলেন, মানসম্মত বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য আগে থেকেই পড়াশোনা ও প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। বক্তাকে আলোচ্য বিষয়, শ্রোতাদের প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট মজলিসের উপযোগী বিষয়বস্তু সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে বক্তব্য দিতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘মিম্বারে বক্তব্যের সময় সংক্ষিপ্ত হওয়া মানে বিষয়বস্তু অগভীর হওয়া নয়।’ বরং একজন বক্তাকে সীমিত সময়ের মধ্যে গভীর ও বাস্তবসম্মত ধর্মীয় শিক্ষা সহজ ও বোধগম্য ভাষায় শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
হাওজায়ে ইলমিয়ার কর্মসূচিতে ধর্মীয় প্রচারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান
বক্তব্যের শেষাংশে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে প্রচারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আয়াতুল্লাহ তাবাসি বলেন, হাওজায়ে ইলমিয়ার কর্মসূচিতে ধর্মীয় প্রচারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা, প্রতিভা ও সক্ষমতাকে ইসলামের শিক্ষা ব্যাখ্যা এবং সমাজের প্রয়োজনীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কাজে নিয়োজিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রচারের গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে শহীদ ইমাম বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাই এ আহ্বানকে গুরুত্ব দিয়ে সমাজে আলেম ও ধর্মীয় প্রচারকদের আরও কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগসহ প্রচারের বিভিন্ন মাধ্যম কাজে লাগিয়ে আহলে বাইতের (আ.) শিক্ষা ও আদর্শ ছড়িয়ে দিতে এবং তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
আপনার কমেন্ট